ছেলে বিসিএস পাস, তবে মায়ের চোখে জল কেন?

0

ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলে থাকেন। প্রতি মাসে মা মাত্র দেড় হাজার টাকা পাঠাতেন। এ টাকায় ছেলের মাসিক খরচ চলত না। তাই সে সকালের নাশতা না খেয়ে একসঙ্গে দুপুরে খেত। সেই ছেলে বিসিএস পাস করে মোবাইল ফোনে খবর জানালে মায়ের চোখে চিকচিক করে অশ্রু। এ অশ্রু আনন্দের।

মা শাহজাহান বেগম (৪৭) জানান, তিনি কক্সবাজার বায়তুশ শরফ চক্ষু হাসপাতালের আয়া। কক্সবাজার শহরের পাহাড়তলিতে তাঁর বাস। স্বামী মোহাম্মদ বাবুল শাহজাহান আলী কাজ করতেন সাগরে মাছধরা নৌকার শ্রমিক হিসেবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের একটি বেকারিতে কর্মরত তিনি। এক কন্যা ও দুই সন্তানের সংসার। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।

এক হাজার ২০০ টাকা বেতনে আয়ার চাকরি নিয়ে সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন তিনি। অদম্য সাহস ছিল তাঁর। চাকরি করেই সন্তানদের লেখাপড়া শেখাবেন। প্রতিদিনের চেষ্টা ছিল যেকোনো উপায়ে বেতনের টাকা সন্তানদের লেখাপড়ার খরচের জন্য রেখে দিতে। এমনকি হাসপাতালের রোগীদের প্রদত্ত ভাত খেয়েও দিন কাটিয়েছেন তিনি। খেয়ে-না খেয়ে শুধু সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় মানুষ করার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। গত ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকা থেকে মোবাইল ফোনে ছেলে কাজী শামীম বলেন, ‘মাগো, আমি বিসিএস পাস করেছি।’ এর পর তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাঁর আরেক ছেলে শাহ আলমগীর কক্সবাজার সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

সন্তানের সাফল্যে মায়ের চোখ-মুখে হাসির বদলে শুধু কান্না। এই কান্না কেন? জবাবে শাহজাহান বেগম বলেন, ‘আমার কুঁড়েঘরে বিদ্যুতের আলো ছিল না। আমার সন্তান পড়েছে কুপি বাতির আলোতে। সন্তানকে আমি বাসি ভাত-তরকারি খাইয়ে লালনপালন করেছি। দিতে পারিনি তার চাহিদার কাপড়চোপড়ও। আমার সেই সন্তানই আজ বিসিএস পাস করেছে। আমি না কেঁদে কে কাঁদবে?’

ছেলে কাজী শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার জন্ম ১৯৯১ সালের ৭ ডিসেম্বর। আমি কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০০৭ সালে এসএসসি ও কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে ২০০৯ সালে এইচএসসি পাস করি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে বিবিএ ও এমবিএ পাস করি। এরপর ৩৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে ৮২তম স্থান অধিকার করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার সফলতার পেছনে কাজ করেছে নিয়মিত অধ্যবসায় ও একনিষ্ঠ পরিশ্রম। স্বপ্নকে সামনে রেখে আমি একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পরিশ্রম করে গেছি কেবল।’

এ বিষয়ে কক্সবাজার বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের মহাপরিচালক এম এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কাজী শামীম মেধাবী ছাত্র ছিল। অত্যন্ত কষ্ট করেই মা তাঁর ছেলেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন।’

কক্সবাজার সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ফরিদ আহমদ বলেন, ‘দরিদ্র পরিবারের সন্তান কাজী শামীম ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তাঁকে আমরা সবাই উদার হস্তে সহযোগিতা করেছি।’

Share.

Leave A Reply