দুই শিশুকে মা জবাই করেন খেলার ছলে! এই সেই মা সবাই দেখুন এবং শেয়ার করে সবাইকে দেখিয়ে দিন-

0

‘এসো আমরা জবাই জবাই খেলি’—এ কথা বলে ধারালো অস্ত্র নিয়ে খেলার ছলে নিজের শিশুসন্তানদের জবাই করেছেন তানজিন আক্তার! পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর এমনটিই দাবি করেন তিনি। সেই সঙ্গে বিলাপ করে বলেন, ‘বাচ্চাদের মেরে ফেললাম! কী ভুল করে ফেললাম!’

গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর উত্তর বাসাবো এলাকায় নিজ বাসায় দুই সন্তানকে গলা কেটে হত্যার অভিযোগে ৩১ বছর বয়সী তানজিনকে গতকাল শনিবার ভোরে ওই এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রাতে মাশরাফি ইবনে মাহবুব ওরফে আবরার (৭) ও মেয়ে হুমায়রা বিনতে মাহবুব ওরফে তাকিয়ার (৬) লাশ উদ্ধার করার পর থেকে পালিয়ে ছিলেন তানজিন। দুই শিশুর বাবা মাহবুবুর রহমান বাদী হয়ে গতকাল তানজিনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

এ মামলায় পুলিশ আদালতের নির্দেশে তানজিনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে। মামলার এজাহারে মাহবুব অভিযোগ করেন, তাঁর স্ত্রী চাপাতি দিয়ে গলা কেটে দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। এজাহারে মাহবুব তাঁর স্ত্রীর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ করেননি। তবে গতকাল তিনি বলেন, স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কোনো বিরোধ ছিল না। দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁরা ভালোই ছিলেন। তবে তাঁর স্ত্রী চার-পাঁচ বছর ধরে মানসিক রোগে ভুগছিলেন।

মানসিক হতাশা থেকে দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন কি না এ বিষয়ে তিনি এখনো নিশ্চিত নন। কেন তাঁর স্ত্রী এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন তা এখনো তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। পুলিশের ধারণা, তানজিন মানসিক রোগী। মানসিক সমস্যা থেকে তিনি এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তানজিন জানিয়েছেন, প্রায়ই তিনি তাঁর স্বামীকে বলতেন, ‘এ সন্তান (আবরার ও হুমায়রা) তোমার নয়, এ সন্তান জিনের। আমি জিনের সাথে মেলামেশা করি। তাদের সাথে মেলামেশা করার পর এদের জন্ম হয়েছে।’ ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, তানজিন জানিয়েছেন, কে যেন তাঁর কানে ফিসফিস করে বলত, ‘তুমি এদের (দুই সন্তানকে) হত্যা করে ফেলো।’

তানজিনের এমন সমস্যা থাকায় তাঁকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করার জন্য বহু চেষ্টাও করেছেন মাহবুবুর রহমান। একটি সূত্রে জানা যায়, তানজিনের বাবা মৃত সালামত উল্লাহ জুজুতান্ত্রিক ছিলেন। ‘জিন ছাড়ানো’, ‘জিন বশে আনা’র বিষয়ে তাঁর ব্যাপক নামডাকও ছিল। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) খিলগাঁও জোনের সহকারী কশিনার ওবায়দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, “তানজিন প্রাথমিকভাবে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। তবে কারণ বোঝা যাচ্ছে না। তানজিনকে মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত মনে হচ্ছে। তিনি জিনের কথা বলেন। ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙেও পড়েছেন। শুধু হাউমাউ করে কাঁদছেন আর বলছেন, ‘কী ভুল করে ফেললাম!’ এখন তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা কঠিন।” সবুজবাগ থানার ওসি আব্দুল কুদ্দুস ফকির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তানজিনকে এখন থানায়ই রাখা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশমতো তাকে হাসপাতালেও নেওয়া হতে পারে। আমরা বের করার চেষ্টা করছি কেন এই হত্যাকাণ্ড।

এর সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না।’ পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, দুই সন্তানকে হত্যার পর বাসা থেকে খালি পায়েই বেরিয়ে যান তানজিন। ওই সময় তাঁর পায়ের তালুতে লেগে থাকা রক্তের দাগ লাগে পুরো বাড়ির সিঁড়িতে। বাড়ির অন্যরা সিঁড়িতে রক্ত দেখে এর সূত্র খুঁজতে গিয়ে দেখে, মাহবুব যে ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন সেখান থেকে রক্তের ছোপ শুরু হয়েছে। ভয়ে কেউ দরজা না খুলে মাহবুবকে ফোন করে। কিন্তু মাহবুব ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর ভাই মোস্তাফিজুর রহমানকে ফোন করে বিষয়টি জানানো হয়। তখন মোস্তাফিজ ফোন করলে মাহবুব ফোন রিসিভ করেন। ফোনে ঘটনা শুনে বাসায় ছুটে দুই সন্তানের গলাকাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখেন মাহবুব।

মামলার এজাহারে মাহবুব উল্লেখ করেছেন, তিনি ঢাকা ওয়াসার কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করেন। ২০০৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তানজিনকে বিয়ে করেন। তাঁদের দুজনের গ্রামের বাড়িই কুমিল্লার মুরাদনগরের সাতমোড় এলাকায়। তাঁরা প্রথমে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি এলাকায় থাকতেন। বিয়ের পর থাকতেন রাজধানীর শাহজাহানপুরে খিলগাঁও বাগিচার ১৭ নম্বর বাড়িতে তানজিনের বাবার বাসায়। গত ১ জানুয়ারি থেকে তাঁরা উত্তর বাসাবোর ১৫৭/২ নম্বর ছয়তলার ওপর চিলেকোঠায় বসবাস শুরু করেন। তাঁদের ছেলে মাশরাফি ইবনে মাহবুব ওরফে আবরার খিলগাঁও বাগিচা হাফিজিয়া মাদ্রাসার নুরানি শাখায় পড়ত এবং মেয়ে হুমায়রা বিনতে মাহবুব ওরফে তাকিয়া পড়ত স্থানীয় দ্বীপশিখা কিন্ডারগার্টেনের কেজি শ্রেণিতে।

মাহবুব এজাহারে উল্লেখ করেন, গত শুক্রবার সকালে তাঁর স্কুল পড়ুয়া এক শ্যালক বাসায় আসে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি শ্যালককে নিজ স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হন। সেখান থেকে ফিরে বাসাবো ঝিলপাড় মসজিদে এশার নামাজ আদায় করেন। রাত সোয়া ৯টার দিকে ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান তাঁকে ফোন করে জানান, বাড়িওয়ালা জানিয়েছেন তাঁদের বাসার সামনে রক্ত। মাহবুব দ্রুত বাসায় ফিরে দেখেন, বাসার দরজা বাইরে থেকে তালা লাগানো। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই তিনি দেখেন, প্রথম কক্ষে হুমায়রার রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। তখন স্ত্রী তানজিনকে চিৎকার করে ডাকেন মাহবুব। এরপর ভেতরের কক্ষে গিয়ে মেঝেতে ছেলে মাশরাফির লাশ দেখতে পান।

এজাহারে মাহবুব অভিযোগ করেন, তানজিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সোয়া ৯টার মধ্যে যেকোনো সময় তাঁর দুই সন্তানকে চাপাতি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছেন। গতকাল মাশরাফি ও হুমায়রার লাশের ময়নাতদন্ত শেষে মুরাদনগরে গ্রামের বাড়ি নিয়ে যায় স্বজনরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, ‘ধারালো অস্ত্র দিয়ে গভীরভাবে গলা কাটার কারণেই দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ছেলেটির গলা এমনভাবে কাটা হয় যে সামান্য চামড়া লেগে ছিল।’

Share.

Leave A Reply