১২ কারণে আপনি যতটা সুখি হওয়া উচিৎ ততটা সুখি নন

0

সুখ অনেকটা কৃত্রিমভাবেই সৃষ্টি করতে হয়। আপনি যদি এটি সৃষ্টি করতে পারেন তাহলেই আপনি সুখি হবেন। আর সৃষ্টি করতে না পারলে সুখি হবেন না। আর যে সুখ দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয় তা অভ্যাসের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হয়। শীর্ষ সুখি ব্যক্তিরা এমন কিছু অভ্যাস রপ্ত করেন যা দিনের পর দিন তাদের সুখ বজায় রাখে।

নতুন করে কোনো অভ্যাস রপ্ত করা একটু কঠিনই বটে। তবে যেসব অভ্যাসের কারণে আপনার সুখ নষ্ট হচ্ছে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলা খুবই সহজ।

অসংখ্য বাজে অভ্যাস রয়েছে যেগুলো আমাদেরকে অসুখি করে তোলে। এই বাজে অভ্যাসগুলো ত্যাগ করলে আপনি অল্প সময়ের মধ্যেই আপনার সুখের পরিমাণ বাড়াতে পারবেন:

১. নেতিবাচক লোকদের সঙ্গে গাটছড়া বাঁধা

সারাক্ষণ নানা বিষয়ে অভিযোগকারী এবং নেতিবাচক মনোভাবাপন্ন লোকেরা দুঃসংবাদ। কারণ এরা সবসময় সমস্যায় ডুবে থাকেন কিন্তু সমাধান খুঁজে পান না। এরা নিজেদের দলে অন্যদেরকেও ভেঁড়াতে চান। যাতে নিজেদেরকে দলে ভারী ভাবার মাধ্যমে নিজেদের ব্যাপারে ভালো অনুভব করতে পারেন। সুতরাং অভিযোগকারীদের কথা শুনতে গিয়ে আপনিও তাদের নেতিবাচক আবেগের জালে জাড়িয়ে পড়বেন না যেন।

২. সামাজিক গণমাধ্যমে লোকে নিজেকে যেভাবে তুলে ধরে তার সঙ্গে নিজের তুলনা করা

হ্যাপিনেস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মাসে অন্তত একসপ্তাহ ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ রাখেন তারা, যারা সবসময়ই ফেসবুক ব্যবহার করেন তাদের চেয়ে বেশি সুখি। যারা ফেসুবক কম ব্যবহার করেছেন তারা নিজেদের জীবন নিয়ে বেশি সন্তুষ্ট এবং কম দুঃখ ও একাকীত্বে ভুগছেন। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মানসিক চাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও ৫৫% বেশি।

ফেসবুক এবং সামাজিক গণমাধ্যম সম্পর্কে সাধারণভাবে যে বিষয়টি সবসময়ই মাথায় রাখতে হতে তা হলো এতে বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে খুব কম। সামাজিক গণমাধ্যমে লোকে নিজেদের জীবনকে বাস্তবের চেয়ে অনেক বেশি রঙ্গীনভাবে হাজির করে।

৩. বিস্মিত না হওয়া

আপনার চারপাশেই প্রতিদিনই বিস্ময়কর সব ঘটনা ঘটে চলেছে। চোখ কান খোলা রাখলেই আপনি তা দেখতে পাবেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত বিপ্লবের ফলে আমাদের জগতটাও ছোট হয়ে এসেছে। এছাড়া প্রযুক্তি আমাদেরকে জগতের অনেক কিছু দেখারও সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফল কিন্তু ভালো হয়নি। কারণ আমরা এখন বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি। খুব কম জিনিসেই আমরা এখন বিস্মিত হই। বিস্ময় আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরাই সমগ্র বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্র নই। বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা অনুপ্রেরণা দায়ক এবং কল্পনায় পূর্ণ। এটি আমাদেরকে জীবনের প্রাচুর্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয়। এবং আমরা যে একই সঙ্গে এতে অবদান রাখতে ও এর দ্বার বন্দিও হতে পারি তা মনে করিয়ে দেয়।

৪.  নিঃসঙ্গতা

নিজেকে সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা অসুখি হওয়ার একটি সচরাচর কারণ। প্রচুর সংখ্যক গবেষণায় বলা হয়েছে, আপনার জন্য এর চেয়ে বাজে কাজ আর কিছু হতে পারে না। এটি মারাত্মক একটি ভুল। কারণ উপভোগ্য না হলেও সামাজিকতা মেজাজ-মর্জি বা মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে।

৫. অভিযোগ করা

সুখি হওয়ার জন্য আমাদের এই অনুভূতি দরকার যে, আমরা নিজেরাই আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ করছি। কিন্তু আপনি যখন নিজে সুখি না হওয়ার জন্য শুধু অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন বা পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর দায় চাপাবেন তখন বুঝতে হবে, আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নিজের জীবনের ওপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটি আপনার মেজাজ-মর্জির জন্য মারাত্মক কুফল বয়ে আনবে।

৬. অতি বেশি নিয়ন্ত্রণবাদি হওয়া

নিজের জীবনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আছে এমন অনুভূতি ছাড়া সুখি হওয়া কঠিন। তবে আপনি আবার নিজেকে ভিন্নভাবেও অসুখি করে তুলতে পারেন। সেটি হলো খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া। নিজেকে ছাড়া অন্যদেরকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে আপনি সুখি হতে পারবেন না। আপনি শুধু নিজেকেই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। আপনি যখন অন্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের খুব বেশি চেষ্টা করবেন তা আপনার জন্য বরং হিতে বিপরীত হবে। আর আপনি যদি কাউকে কিছুটা সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হনও তাতে বলপ্রয়োগ বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ দরকার হয়। আর অন্যদের সঙ্গে এভাবে আরচণ করলে আপনার নিজের ব্যাপারেও ভালো অনুভূতি হবে না।

৭. অভিযোগ করে সুখি বোধ করা

আপনাকে যা কিছু অসুখি করে তা নিয়ে অবিযোগ করে হয়তো আপনি কিছুটা ভালো অনুভব করতে পারেন। কিন্তু অনবরত অভিযোগ করলে লোকে আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যাবেন।

৮. প্রভাবিতকরণ

লোকে আপনার কাপড়, গাড়ি এবং আপনার মোহময়ী চাকরিটি হয়তো পছন্দ করতে পারেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা আপনাকেও পছন্দ করবেন। অন্যকে প্রভাবিত করতে চাওয়ার প্রবণতাও অসুখি হওয়ার একটি উৎস। কারণ এর ফলে যারা সত্যিই আপনাকে পছন্দ করে এবং আপনি যেমন আছেন তেমনভাবেই আপনাকে গ্রহণ করতে পারে তাদেরকে খুঁজে পাবেন না আপনি। প্রচুর সংখ্যক গবেষণায় দেখা গেছে, বস্তুগত জিনিস কাউকে সুখি করতে পারে না। কারণ আপনি যখন কোনো কিছুর পিছু তাড়া করবেন তখন আপনার অসুখি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ সেটি পাওয়ার পর আপনি দেখবেন যে এমন কিছু বাস্তব জিনিস হারানোর বিনিময়ে আপনি সেটি পেয়েছেন যেগুলো আপনাকে হয়তো আরো বেশি সুখি করত। যেমন বন্ধু, পরিবার এবং নিজের যত্ন নেওয়া।

৯. নেতিবাচকতা

জীবন সবসময় আপনি যেভাবে চাইবেন সেভাবেই সামনে এগোবে না। তবে আপনারও অন্যদের মতোই দিনে ২৪ ঘন্টা সময় হাতে থাকে। সুখি লোকেরা নিজেদের সময় গুনে চলেন। কোনো বিষয় কেমন হওয়া উচিৎ ছিল তা নিয়ে অভিযোগ করার পরিবর্তে তারা বরং যেসব বিষয়ে তাদের কৃতজ্ঞ হওয়ার দরকার সেসব নিয়েই ভাবেন। আর এভাবেই তারা সমস্যারে সেরা সমাধানটি পেয়ে যান এবং সামনে এগিয়ে যান। হতাশা বা দুঃখবাদের মতো আর কোনো কিছুই মানুষকে এতো বেশি অসুখি করে না। আপনি যদি খারাপ কোনো কিছু প্রত্যাশা করেন তাহলে আপনি খারাপই অর্জন করবেন। সুতরাং সবসময়ই জোর করে হলেও বাস্তবটা বুঝার চেষ্টা করুন। তাহলে আপনি দেখবেন সবকিছুকে যতটা খারাপ মনে হয় তারা আসলে ততটা খারাপ নয়।

১০. লক্ষ্য নির্ধারণে অনীহা

সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য থাকলে তা আপনাকে আশান্বিত করবে। আর এতে আপনি উন্নত ভবিষ্যতের দিকে তাকাতেও সক্ষম হবেন। আর সেসব লক্ষ্য অর্জনে কাজ করতে সক্ষম হবেন যেগুলো আপনাকে নিজের সম্পর্কে এবং নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে ভালো লাগার অনুভূতি এনে দেবে। সুতরাং চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং নিজস্ব মূল্যাবোধ দ্বারা পরিচালিত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। লক্ষ্য নির্ধারণ ছাড়া, শেখার মাধ্যমে নিজের উন্নয়ন ঘটানো ছাড়া আপনি নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারবেন না।

১১. ভয়

ভয় আপনার কল্পনায় সৃষ্ট একটি আবেগ ছাড়া আর কিছু্ই না। আপনি কোনো কিছুতে ভীত হবেন কি হবেন না তা একান্তই আপনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। সুখি লোকেরা আর কারো চেয়ে এটা বেশি জানেন। সুতরাং তারা ভয়কে এর মাথায় টোকা মেরে জয় করেন। ভয়কে জয় করার মাধ্যমে তারা যে তীব্র সুখের অনুভূতি অর্জন করেন তাতেই তারা বুঁদ হয়ে থাকেন। সুখি লোকেরা জানেন মৃত্যুর চেয়েও বেশি ভয়ানক ব্যাপার হলো জীবিত থাকা অবস্থায়ই ভয়ে নিজের ভেতরে মরে যাওয়া।

১২. বর্তমানকে ভুলে যাওয়া

ভয়ের মতো অতীত এবং ভবিষ্যতও আপনার মনের ভেতরে উৎপাদিত হয়। আপনি যতই অপরাধবোধ বা উদ্বেগে ভোগেন না কেন তাতে আপনার অতীত মুছে যাবেনা বা ভবিষ্যতও বদলাবে না। সুখি লোকেরা এটা ভালো বুঝেন। আর এ কারণেই তারা বর্তমানে বাস করার ব্যাপারে মনোযোগী হন। আপনি যদি প্রতি মুহূর্তের বিদ্যমান বাস্তবতাকে মেনে নিতে না পারেন তাহলে আপনি আপনার পুর্ণ সম্ভাবনার বিকাশ ঘটাতে পারবেন না। বর্তমানে বাস করার জন্য আপানাকে দুটি কাজ করতে হবে:

১০) অতীতকে মেনে নেওয়া। আপনি যদি আপনার অতীতের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করতে না পারেন তাহলে তা আপনার পিঁছু ছাড়বে না এবং তা আপনার ভবিষ্যতকে প্রভাবিত করবে। সুখি লোকেরা জানেন অতীতের দিকে তাকানোর একমাত্র ভালো কারণটি হলো কতদূর এসেছেন তা ফিরে দেখা।

২) ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মেনে নেওয়া। আর কখনোই নিজের কাছ থেকে অহেতুক প্রত্যাশা করবেন না। ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ারও কোনো কারণ নেই। মার্ক টোয়েন বলেছেন, “ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মানে হলো আপনি যে ঋণ করেননি তার দায় নিজের কাঁধে নেওয়া।
সূত্র: ফোবর্স

Share.

Leave A Reply