পুরুষ তুমি মানুষ হও

0

খবরটা শুনেই সিলেটের কলেজছাত্রী খাদিজাকে কোপানোর নির্মম দৃশ্য মনে এল। একটি মেয়েকে কোপানো হচ্ছে, সবাই দেখছে। কেউ প্রতিবাদ করছে না। পরদিন ১৯ অক্টোবর বুধবার সকালেই জানলাম বখাটেদের উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় মিরপুরে একাদশ শ্রেণির দুই যমজ বোনকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে বখাটেরা। এই তো কিছুদিন আগেই বখাটের হামলায় প্রাণ গেল চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্কুলছাত্রী কণিকা ঘোষের। রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সুরাইয়া আক্তার রিসা ও মাদারীপুরের নিতুর কথা নিশ্চয়ই অনেকে ভোলেননি।

প্রতিটি ঘটনাই ঘটিয়েছে পুরুষ নামের কতগুলো ‘মানুষ’। আসলেই কি তারা মানুষ? মানুষ কি কখনো মানুষকে কোপাতে পারে? মানুষ হলে নিশ্চয়ই তারা নারীর চলার পথকে বাধাগ্রস্ত করত না। যে বখাটেরা এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা কি একবারও ভাবে না এই দেশেই তো তাদেরও মা, বোন কিংবা অন্য কোনো স্বজনকে চলাফেরা করতে হয়। পুরুষ হয়ে আমরা যদি আরেকটি মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে আমার মা-বোনকে নিরাপত্তা দেবে কে?

প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, এই একবিংশ শতাব্দীতেও কেন নারীর জন্য একটা নিরাপদ রাষ্ট্র হলো না? সেই পঞ্চাশ বা ষাটের দশকের ছবিগুলো যখন দেখি ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধসহ প্রতিটি রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনে নারীরা রাজপথে, তখন গর্ব হয়। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে, বাসে-ট্রেনে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বত্রই আজ নারীরা নিপীড়নের শিকার। রেহাই নেই ফেসবুক বা অনলাইনেও।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর সারা দেশে উত্ত্যক্তের শিকার হয় ৩৬২ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে তাৎক্ষণিক প্রতিকার না পেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে ২২ জন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০৯ জন নারী বখাটেদের উৎপাতের শিকার। আর ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫১২টি।

এসব পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে বাংলাদেশে নারীরা কতটা সংকটে। কেউ যদি বাংলাদেশ পুলিশের ওয়েবসাইটে গিয়ে বাংলাদেশের নানা ধরনের অপরাধের তথ্য দেখেন তিনি চমকে উঠবেন। চুরি, ডাকাতি, খুন, অপহরণ যেকোনো অপরাধের চেয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা অনেক বেশি ঘটে এ দেশে। গত এক যুগে সেই সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। এ পরিসংখ্যান দেখে প্রশ্ন জাগে, আদৌ কি আমরা সভ্য হয়েছি?

১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস ছিল। দিবসটিকে সামনে রেখে সেভ দ্য চিলড্রেন এবার বৈশ্বিক লিঙ্গসমতার সূচকের যে তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১১তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। এমন অবস্থা কি চলতেই থাকবে?

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এমন দিন খুব কমই গেছে যেদিন দেশের কোনো না কোনো প্রান্ত থেকে নারী নিপীড়নের খবর আসেনি। কখনো তনু, কখনো রিসা, কখনো খাদিজা আছেই এই দেশের খবরে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. নূর খান মনে করেন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হলে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এরা একটু ভয় পেত। এ জন্য বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে।

২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট বিভাগ যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি নির্দেশনামূলক রায় দেন। তাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্রসহ সর্বস্তরে নারীর ওপর যৌন হয়রানিমূলক আচরণ প্রতিরোধে নির্দেশনা দেওয়া হয়। কেউ অশোভন আচরণের শিকার হলে নিকটস্থ থানায় বা দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাকে জানাতে পারেন। অনলাইনের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে এবং মুঠোফোনের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হলে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করার সুযোগ আছে। আবার দণ্ডবিধির ৫০৯ ধারা অনুযায়ী, কোনো নারীকে নিয়ে কটূক্তি করা হলে এক বছর কারাদণ্ড হতে পারে। ঢাকা মেট্রোপলিটন অধ্যাদেশের ৭৬ ধারা অনুযায়ী, নারীদের উত্ত্যক্ত করার শাস্তি কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ড। আবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেও ১০ বছর সাজার বিধান আছে। কিন্তু শুধু আইন দিয়ে কি সমস্যার সমাধান সম্ভব? নাকি মানসিকতা বদলানো জরুরি।

বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তেই নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটুক না কেন একজন পুরুষ হিসেবে তা আমাকে খুব লজ্জিত করে। সবাই মিলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে কলঙ্কজনক এসব ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব। আরেকটা বিষয়, সত্যিকারের মানুষ কখনো নারী নিপীড়ন করতে পারে না। যারা এসব ঘটাচ্ছে তারা হয় ‘পুরুষ’ কিংবা পশু হয়েই জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। কাজেই পুরুষ জাতির কাছে অনুরোধ, চলুন আমরা সত্যিকারের মানুষ হই।

বিঃ দ্রঃ মজার মজার রেসিপি ও টিপস, রেগুলার আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডি রান্নাঘরে।

Share.

Leave A Reply