রহস্যময় পেটব্যাথায় ৫ বছর না খেয়ে তিনি, এর পর…

0

মেডিক্যাল টিম ম্যাকেঞ্জি হিল্ডের বিছারা ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারা বুঝে উঠতে পারেন না বিষয়টি।

হিল্ড এক ডাক্তারের বক্তব্য তুলে ধরেন। জানান, আমার সব পরীক্ষা করা হয়েছে। সবই স্বাভাবিক ফলাফল এসেছে। বিখ্যাত বোস্টন হসপিটালের চিকিৎসকরা কিছুই খুঁজে পান না। হিল্ডের ওজন ব্যাপকভাবে কমে আসা তার জন্য জীবনঘাতি হয়ে ওঠে। ১৯ বছর বয়সী হিল্ডের সমস্যাটা হলো, খাবার খেতে গেলে তার পেটে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। সমস্যা বুঝতে তাকে ইটিং ডিসঅর্ডার সেন্টারে পাঠানো হয়।

৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার হিল্ডের ওজন এক সময় ছিল ৭৫ কেজি। তিনি ক্ষুধায় কিছু খাওয়ার জন্য কান্না করতেন। কিন্তু খেতে পারতেন না। তিনি ক্ষুধামন্দায় ভুগছিলেন।

২০১০ সালের স্মৃতিচারণ করেন তিনি। আমি চিকিৎসকদের বোঝাতে পারতাম না যে, আমার মাথায় কোনো সমস্যা নেই। আমি তাদের চিৎকার করে বোঝানোর চেষ্টা করতাম।

পরের ৫ বছরে তিনি মনে করতেন, তার মানসিক চাপ, মনোযোগের অভাব বা কেবল ক্ষুধার কারণেই এমনটা হতো। তিনি খেয়াল করে দেখেছেন, খাওয়ার ৪ ঘণ্টা পর্যন্ত তার পেটে তীব্র ব্যথা চলতো।

বিভিন্ন বড় বড় হাসপাতালে একের পর এক চিকিৎসার পরও তার সমস্যা কেউ ধরতে পারেনি। এর কোনো ব্যাখ্যাও দিতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। পিত্তথলী ফেলে দিয়েও কোনো উপকার মেলেনি। পাঁচটা বছর ধরে গিল্ড কিছু খেতে পারতেন না। এই দীর্ঘ সময় প্রতিবেলা প্রতিদিন তিনি টিউবের মাধ্যমে খাবার খেয়ে বেঁচেছিলেন। এই সময়ের মধ্যে কলেজে গিয়েছেন। দুটো গ্রীষ্মে নাভাজো রিজার্ভেশনে কাজ করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় ১০ মাসের ফেলোশিপ নিয়ে গেছেন। খাওয়া এবং এর তীব্র ব্যথার কথা মন থেকে ঝেরে ফেলতে চান তিনি। চিকিৎসার কথাও মনে আনেননি। কারণ এটা কোনো কাজেই দিচ্ছে না।

গত বছর এক ঘটনা অনেক কিছুই বদলে দিলো। ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদায় রোমাঞ্চকর অভিযানকালে হিল্ডের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা হলো এক মেডিক্যাল স্কুলের প্রফেসরের। তিনি হিল্ডের কথা শুনলেন এবং চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে রিভিউ প্রস্তুত করতে বললেন। তারা হিল্ড সম্পর্কে বিশাল এক ফাইল প্রস্তুত করলেন। তা জমা দেওয়া হলো শিকাগোর এক সার্জনের কাছে। এর ওপর ভিত্তি করে ২০১৫ সালের মার্চে ওই সার্জন আড়াই ঘণ্টার এক অস্ত্রপচার করলেন হিল্ডের দেহে। আর এ অপারেশনতার জীবনটা বাঁচিয়ে দিলো।

ছোটকাল থেকে হিল্ডের আশা ছিল আফ্রিকায় চিকিৎসক হিসাবে কাজ করার। বর্তমানে তার বয়স ২৬ বছর এবং তিনি ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের দ্বিতীয় বর্ষের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী। ২০০৯ সালে হার্ভার্ডে প্রবেশের আগে উগান্ডার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্লিনিকে ৩ মাস কাজ করেছেন তিনি। তখন থেকেই খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিল্ডের পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হতো। এ কারণে তখন ১৫ পাউন্ড ওজন কমে যায় তার।

নেভাদায় বাড়ি ফিরে তিনি ওষুধ খাওয়া শুরু করলেন। এতে ব্যথা কমে যেতো, কিন্তু পুরোপুরি চলে যেতো না। পরজীবী রয়েছে কিনা তাও পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু কোনো পরীক্ষাতেই কিছুই মেলে না।

২০১০ সালে হিল্ড যখন বিমান থেকে ক্যালিফোর্নিয়া নামেন, তারা পরিবার একটা ধাক্কা খান। তার ৩৫ পাউন্ড ওজন তখন কমে গেছে। চিকিৎসকরা ক্রনস জিজিস, এইচআইভি’সহ বিভিন্ন রোগের পরীক্ষা করা হয়। কোনো ফলাফলেই কিছু মেলেনি।

মেডিক্যাল স্কুলে অবস্থার অবনতি হলে তিনি স্টুডেন্ট হেলথ সেন্টারে যান। বিশেষজ্ঞরা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে বোস্টন হাসপাতালে পাঠান। সেখানে টানা এক মাস তাকে সেই বিভাগে রাখা হয় যেখানে ক্ষুধামন্দায় ভোগা মানুষদের চিকিৎসা চলে। জোর করে খাওয়ানো হতো তাকে। প্রচণ্ড ব্যথা কাতরাতেন। তবে এতে ২০ পাউন্ড ওজন বাড়ে তার। মেডিক্যাল ছুটি নিয়ে তিনি বছরের বাকি সময় বাড়িতেই থাকেন।

২০১১ সালে ব্যথা এতটাই বেড়ে যায় যে তিনি ফিডিং টিউবে খেতে শুরু করেন। নাকে দিয়ে ঢুকানো পাইপে খাবার যায় পাকস্থলীতে। এতে তার পেট কিছুটা বিশ্রাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে বলেই মনে করেছিলেন চিকিৎসকরা।

ওজন যখন ১০৫ পাউন্ড হলো, তাকে হার্ভার্ডে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। পড়াশোনায় ফিরে যান হিল্ড। কিন্তু এটা তো আর সমাধান না। বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় পুষ্টি তিনি টিউবের মাধ্যমে নিতে থাকলেন।

এভাবে বাঁচাও যায় না। অন্যান্য সমস্যা রয়েছে। টিউবের কারণে সংক্রমণ ঘটে গেলো। এভাবে খাবার নিয়মিত আসার ফলে পাকস্থলীর অবস্থা খারাপ হতে থাকলো। সপ্তাহে কয়েকবার উচ্চ পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ খাবার খেতেন। কিন্তু এরও ধকল রয়েছে। সকাল ৮টায় খাওয়ার পর ৪ ঘণ্টা বিছানায় শুয়ে থাকতে হতো।

২০১২ সালে সান ফ্রান্সিসকোর সার্জনরা টিউব খুলে ফেলেন। আরেকটি টিউব প্রতিস্থাপন করেন পেটে। তার পিত্তথলীও ফেলে দেওয়া হয়। ব্যথা কোনো অবস্থাতেই কমে না।

২০১৪ সালে মে মাসে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। এর কয়েক মাস পরই ১০ হাজার মাইল দূরে অনুষ্ঠিতব্য একটি সভা যে তার জীবন বদলে দেবে, কে জানতো?

আগস্টে হিল্ডের বাবা-মায়ের সিয়েরাসে ওই মেডিক্যাল প্রফেসরের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি রোগীর জটিল সমস্যা নিয়ে কনসাল্ট করেন। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বিশেষজ্ঞ তিনি। পরের কয়েক মাস ওই বিশেষজ্ঞ এবং তার শিক্ষার্থী জেসিকা গোল্ড স্কাইপেতে হিল্ডের সঙ্গে চ্যাট করতে থাকলেন। জেসিকা জানান, আমি অবাক হয়েছি যে, হিল্ডকে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ দেখে ফেলেছেন। কিন্তু সমাধান মেলেনি। সে ক্ষেত্রে আমি তার জন্য কিম করতে পারি।

জেসিকা হিল্ডের অতীত চিকিৎসার ইতিহাস এবং নিজের কিছু প্রশ্ন নিয়ে বিশাল রিপোর্ট তৈরি করলেন। ‘পোস্টপ্র্যান্ডিয়াল অ্যাবডোমিনাল পেইন’ নামে সার্চ দিলেন তিনি। সেখানে দেখা গেলো, এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় মেডিয়ান আর্কুয়েট লিগামেন্ট সিনড্রোম (এমএএলএস-মালস)। এ অবস্থার সৃষ্টি হয় যখন এক ধরনের সংযোগকারী টিস্যু যার নাম আর্কুয়ের লিগামেন্ট ডায়াফ্রামের ভিত্তিমূল থেকে আয়োর্টার ওপর দিয়ে আড়াআড়ি চলে যায়। এটি সেলিয়াক আর্টেরির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। সেলিয়াক আর্টেরি পাকস্থলী এবং অন্যান্য প্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ করে। এটি বিরল এক অবস্থা। এমন দৈহিক বৈশিষ্ট্য জনসংখ্যার ১০-২০ শতাংশের মধ্যে দেখা যেতে পারে। এদের ১ শতাংশের এমন ব্যথা হয়। সার্জারির মাধ্যমে ব্যথা চলে যায় ৭০ শতাংশ রোগীর।

জেসিকা আগে কখনো মালস সম্পর্কে শোনেননি। কিন্তু তা হিল্ডের অবস্থার সঙ্গে মেলে। তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে হিল্ডের মালস হয়েছে। জেসিকা বেশ কয়েক জায়গায় এই কেসটি নিয়ে তথ্য পাঠান। একমাত্র সাড়া মেলে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো মেডিক্যাল সেন্টারের ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের প্রধান ক্রিস্টোফার স্কেলির কাছ থেকে।

পরে একটি ভুল সিটি স্ক্যানে ভুল ফলাফল আসে। তারপরও মালসকে মাথায় রেখেই মার্চের ১৮ তারিখে সার্জারি হয় হিল্ডের। পর দিন তিনি হাসপাতাল থেকে দেওয়া ডিমের একটি অংশ খান। অপেক্ষায় থাকেন, ব্যথা শুরু হয় নাকি। যখন কোনো ব্যথা অনুভব করলেন না, হাউমাউ করে কান্না শুরু করলেন হিল্ড। এই সমস্যাকে ঘিরে আরো নানা সমস্যা শুরু হয় হিল্ডের। ধীরে ধীরে সবই দূর হতে থাকে। আর সেই দুঃস্বপ্নের মতো ব্যথা কখনোই ফেরত আসেনি হিল্ডের জীবনে।

Share.

Leave A Reply